ঢাকা, ২৪ মে, ২০২৬ (বাসস) : পবিত্র ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে দেশের মসলার বাজার বছরের অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি জমে উঠেছে।
কোরবানির মাংস রান্না, সংরক্ষণ ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিতরণকে ঘিরে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়েছে মসলার চাহিদা।
বিশেষ করে জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, শুকনা মরিচ, ধনিয়া, জয়ফল, জয়ত্রী ও তেজপাতা বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
তবে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দুটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বিক্রি এবং ভেজাল মসলার বিস্তার। পাইকারি বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও খুচরা বাজারে তা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা।
একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিম্নমানের ও ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে বাজারে ভেজাল মসলা সরবরাহ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাজারে বেড়েছে মসলার চাহিদা
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, চকবাজার ও রামপুরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ সামনে রেখে পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির সময় মসলার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বছরই বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
বর্তমানে রাজধানীর খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়; দারুচিনি ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকায়; লবঙ্গ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় এবং এলাচ ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। এছাড়া শুকনা মরিচের গুঁড়া ৫০০ টাকা, ধনিয়ার গুঁড়া ২০০ থেকে ২৮০ টাকা এবং গোলমরিচ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে বিশেষ করে জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ ও মরিচের দাম কিছুটা বেড়েছে। আমদানি ব্যয়, ডলারের উচ্চ মূল্য এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকে তারা এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
গত বছরের তুলনায় কিছু পণ্যের দাম কম
যদিও খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে, তবুও গত বছরের তুলনায় কিছু মসলার দাম কমেছে। গত বছর কোরবানির ঈদের আগে জিরার দাম ছিল প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। এবার সেই একই জিরা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে।
একইভাবে কিছু মানের এলাচ ও দারুচিনির দামও কমেছে। গত বছর এলাচের দাম হঠাৎ বেড়ে ৪ হাজার ২০০ টাকার ওপরে উঠেছিল। এবার মানভেদে এলাচ ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে থাকলেও বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফেরায় এলাচের বাজার এবার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
দারুচিনির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ভিন্নতা। বর্তমানে চীনা ভাঙা দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ থেকে ৪০০ টাকায় এবং ভিয়েতনামের আস্ত দারুচিনি ৪২০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ দুই ধরনের দারুচিনির দামই কিছুটা কম।
অন্যদিকে গোলমরিচের বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। গত বছর কালো গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৯৫০ টাকা কেজি দরে। এবার তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০ টাকা। তবে সাদা গোলমরিচের দাম কিছুটা কমে ১ হাজার ২২০ টাকায় নেমেছে।
আমদানি বেড়েছে, সরবরাহে স্বস্তি
হিলি কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত জিরা, ছোট এলাচ, কাজুবাদাম ও কিসমিসসহ প্রায় ২৬ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জিরা ও ছোট এলাচ আমদানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মেট্রিক টন।
মসলা আমদানিকারক হযরত আলী সরদার বলেন, আমদানি স্বাভাবিক থাকলে ঈদে মসলার দাম ভোক্তার নাগালের মধ্যেই থাকবে। চাহিদা বাড়ায় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে মসলা জাতীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। বর্তমানে আদা, জিরা, ছোট এলাচ, মহুরি, কিসমিস ও কাজুবাদামসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ এলাচ, দারুচিনি, জিরা, লবঙ্গ, আদা ও রসুন আমদানি হয়েছে। বিশেষ করে আদা ও দারুচিনির আমদানি বেশি হওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি নেই।
হিলি কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা নাজ্জাসী পারভেজ বলেন, আসন্ন কোরবানি ঈদ সামনে রেখে আদা, জিরাসহ মসলা জাতীয় পণ্যের পরীক্ষণ ও শুল্কায়ন শেষে দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
খুচরা বাজারে অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ
পাইকারি বাজারে দাম কম থাকলেও খুচরা বাজারে অনেক পণ্য অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে ৪ হাজার ২০০ টাকার এলাচ খুচরা বাজারে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ৪০০ টাকার দারুচিনি খুচরায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর পলাশী বাজারে কেনাকাটা করতে আসা এক গৃহিণী বলেন, ঈদ এলেই বাজারে সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। গত বছর যে টাকায় বাজার করেছি, এবার একই জিনিস কিনতে অনেক বেশি টাকা লাগছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগে খুচরা পর্যায়ে কিছু ব্যবসায়ী বাড়তি মুনাফা করছেন। প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো গেলে এ ব্যবধান কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
বাড়ছে ভেজাল মসলার ঝুঁকি
ঈদের ব্যস্ত বাজারে আরেকটি বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেজাল মসলা। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ভেজাল মসলা জব্দ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত এক মাসে কারওয়ান বাজার, চকবাজার ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৮ টন নিম্নমানের ও ভেজাল মসলা জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৩২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে দেখা গেছে, হলুদের গুঁড়ায় টেক্সটাইল রং ও সিসাযুক্ত ক্রোমেট; মরিচের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া ও কৃত্রিম রং; ধনিয়ার গুঁড়ায় কাঠের গুঁড়া এবং জিরার গুঁড়ায় নিম্নমানের শুকনো খৈল মেশানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পরীক্ষাগারে পাঠানো মসলার নমুনার প্রায় ২৮ শতাংশে ভেজালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ভেজাল ধরা পড়ে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায়।
জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল মসলায় ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এফ এম হেলালুদ্দিন বাসসকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতেই পারছে না যে তারা প্রতিদিন বিষাক্ত রাসায়নিক গ্রহণ করছে। অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের মসলা ও অস্বাভাবিক কম দামের পণ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সরকারের নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান বাসসকে বলেন, সরকার ঈদকে সামনে রেখে মসলার বাজারে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বাজার নিয়মিত মনিটরিংয়ের পাশাপাশি ভেজালবিরোধী অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি বা ভেজাল মসলা বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত আমদানি, বাজার তদারকি এবং ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলে ঈদের আগের শেষ সময়ে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে। একই সঙ্গে সচেতন ক্রয় ও বিএসটিআই অনুমোদিত পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ভোক্তারাও ঝুঁকি কমাতে পারবেন।

