ঢাকা, ৭ জুলাই ২০২৬ (বাসস) : দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা আটালান্টায় মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় ম্যাচে পরাজিত করে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে। দ্বিতীয়ার্ধে ১১ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল করে আর্জেন্টিনা অসাধারন এক জয়ে গল্প রচনা করলো।
ম্যাচের নাটকীয়তা কম ছিলনা। দলের প্রাণভোমরা মেসি পেনাল্টি মিস করেছেন। পরে আবার সেই মেসির গোলেই ম্যাচে সমতা ফিরিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। তার আগে দুই গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা মেসির এ্যাসিস্টে ম্যাচে ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়। ইয়াসির ইব্রাহিম ও মোস্তফা জিকোর গোলে মিশর যখন ঐতিহাসিক এক জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখনই বরাবরের মত মেসি দলের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
স্টপেজ সময়সহ শেষ ১১ মিনিটে আর্জেন্টিনা ফিরে আসার গল্প রচনা করে।
এনিয়ে টানা নয় বিশ্বকাপ ম্যাচে গোলের রেকর্ড গড়লেন মেসি। একইসাথে আট গোল করে টুর্নামেন্টের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আরও এগিয়ে গেলেন।
ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেডে আর্জেন্টিনার গোলে সূচনা। এরপর মেসির গোলে সমতা এবং স্টপেজ টাইমের দুই মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের গোলে জয় নিশ্চিত হয়। আর এতেই হৃদয় ভাঙ্গে মোহাম্মদ সালাহর মিশরের।
ম্যাচ শেষে দুর্দান্ত এই প্রত্যাবর্তনে মেসিকে চোখের পানি ফেলতে দেখা গেছে। মিশরের বিপক্ষে একাধিক বিতর্কিত রেফারিং সিদ্ধান্ত যাওয়ায় দলটি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর মধ্যে ছিল দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তাদের একটি গোল বাতিল হওয়া। এছাড়া আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের পরবর্তী উত্তেজনায় মিশরের কোচিং স্টাফের একজন সদস্য লাল কার্ডও দেখেন।
শেষ ৩২-এর ম্যাচে শুক্রবার কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে জয়ের শেষদিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ক্লান্ত দেখানোর পর কোচ লিওনেল স্কালোনি দলে কিছু পরিবর্তন আনেন। মিয়ামিতে শুরু করা একাদশ থেকে নিকোলাস টাগলিয়াফিকো, লিন্দ্রো পারেদেস ও জুলিয়ান আলভারেসকে দলে নিলেও আর্জেন্টিনা আবারও ধীরগতিতে ম্যাচ শুরু করে।
মারওয়ান আতিয়ার ক্রস পেছনের পোস্টে পৌঁছালে ইয়াসের শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠিয়ে ১৫ মিনিটে মিশরকে এগিয়ে দেন।
পাঁচ মিনিট পর সমতায় ফেরার সুযোগ পায় আর্জেন্টিন। বক্সের ভেতরে হাইসেম হাসানের ফাউলের শিকার হন টাগলিয়াফিকো। কিন্তু বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে লিওনেল মেসির দুর্ভাগ্যের গল্পে যোগ হয় আরেকটি অধ্যায়। আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ীর নেওয়া শটটি ছিল কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্তভাবে তা ঠেকিয়ে দেন। ফলে বিশ্বকাপে টাইব্রেকার বাদে নেওয়া আটটি পেনাল্টির মধ্যে চারটিই এখন মিস করলেন মেসি। একই সঙ্গে তিনি এক আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম ফুটবলারও হলেন। এর আগে গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও তিনি পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
এরপর একেবারে কাছ থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শক্তিশালী হেডও দারুণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন আল আহলির এই গোলরক্ষক।
এরপর আলভারেসের নিচের কোণ লক্ষ্য করে নেওয়া শট অসাধারণ এক সেভে ঠেকিয়ে দিয়ে তিনি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা সেভগুলোর একটি উপহার দেন।
এক ঘণ্টা খেলার পর দুর্দান্ত এক পাল্টা আক্রমণ থেকে মিশর ভেবেছিল তারা ব্যবধান দ্বিগুণ করেছে। মোহাম্মদ সালাহ বল বাড়িয়ে দেন মোস্তফা জিকোর কাছে। তিনি এগিয়ে আসা এমি মার্টিনেসের ওপর দিয়ে নিখুঁত চিপ শটে বল জালে পাঠান।
কিন্তু গোল উদযাপন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। গোলের আক্রমণ গড়ে ওঠার শুরুতে মিশরের বক্সের ঠিক বাইরে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের ওপর ফাউলের অভিযোগে ভিএআরের অত্যন্ত বিতর্কিত হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল হয়ে যায়।
এই সিদ্ধান্তে গ্যালারিতে থাকা অধিকাংশ আর্জেন্টাইন সমর্থক উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর আরেকটি দ্রুতগতির মিশরীয় পাল্টা আক্রমণে তারা আবারও স্তব্ধ হয়ে যায়। আবারও আক্রমণের নেতৃত্ব দেন সালাহ। তিনি বল বাড়িয়ে দেন হাসানের কাছে, যার নিচু ক্রস থেকে জিকো সহজেই বল জালে জড়ান।
দ্বিতীয়ার্ধেও কুলিং ব্রেকের সময় মেসিসহ আর্জেন্টিনার অনেক খেলোয়াড়কে মাথা নিচু করে থাকতে দেখা যায়। তখন মনে হচ্ছিল দলটি পরাজয়ের দিকেই এগোচ্ছে।
কিন্তু ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেডে আর্জেন্টিনা অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সূচনা করে। শিরোপাধারীরা যেন পরাজয়ের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ায়।
কিছুক্ষণ পর মেসির দুর্দান্ত একক দৌড় থেকে সুযোগ পান লটারো মার্তিনেস, কিন্তু তাঁর হেড অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হতে সাত মিনিট বাকি থাকতে নিজের মুক্তির মুহূর্তটি পেয়ে যান মেসি। গনসালো মন্টিয়েল বল পেছনে বাড়িয়ে দিলে ৮৩ মিনিটে অধিনায়ক মেসি দারুণ এক হাফ-ভলিতে শট নেন।
শোবেইর আবারও বলে হাত ছোঁয়াতে সক্ষম হলেও তা বাইরে ঠেলে দিতে পারেননি। বল ক্রসবারে লেগে জালে ঢুকে যায়, আর তাতে বিশ্বকাপে নিজের ২১তম গোলটি করেন মেসি।
লটারো মার্তিনেসের ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজের শক্তিশালী হেড আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণ করে। শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনা শিবিরের স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস ছিল স্পষ্ট।

