বুধবার , ১৭ জুন ,২০২৬। নিজস্ব প্রতিবেদক:
গাজীপুরকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তোলার মহৎ লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (গাউক)। তবে প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানটি রূপ নিয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে। গাউক-এর একশ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের গড়ে তোলা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। বৈধ উপায়ে কোনো কাজের জন্য ফাইল জমা দিলে নাগরিকদের মাসের পর মাস হয়রানি পোহাতে হচ্ছে, অথচ মোটা অঙ্কের অলিখিত ঘুষের বিনিময়ে সিন্ডিকেটের হাত ধরলেই সেই ফাইল অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে নিমিষেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুর্নীতি সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান হোতা ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী। তার বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তার এই অপকর্মের খতিয়ান প্রকাশ পেলেও অদৃশ্য খুঁটির জোরে তিনি বহাল তবিয়তে আছেন; কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
মুরাদ আলী সিন্ডিকেটের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বর্তমান নকশাকার আবু রায়হান। জানা যায়, অতি সম্প্রতি আবু রায়হান ‘রেখাকার’ (Tracer) পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে ‘নাকশাকার’ (Draftsman) হয়েছেন। দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এবং কোন যোগ্যতায় তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রমোশন পেলেন, তা নিয়ে খোদ অফিসের ভেতরে-বাইরে নানা গুঞ্জন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গাউক অফিসে ভবনের নকশা অনুমোদনের কোনো ফাইল আসলে অন্যান্য নকশাকারদের বঞ্চিত করে সিংহভাগ কাজই আবু রায়হানের টেবিলে পাঠানো হয়। রায়হান সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ফাইল আটকে রেখে সম্পূর্ণ কাজের চুক্তি বা ‘প্যাকেজ ডিল’ করতে বাধ্য করেন। একজন নকশাকারের মূল দায়িত্বের বাইরে গিয়েও, তিনি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ফাইলের অবৈধ ‘টেবিল মুভমেন্ট’ করিয়ে আনেন। ফলে ছোট থেকে বড়—যেকোনো বৈধ কাজের অনুমোদনের জন্য সাধারণ মানুষকে চরম অর্থদণ্ড ও মানসিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
মুরাদ আলী ও আবু রায়হানের মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অনৈতিক প্রশ্রয় ও অবৈধ বাণিজ্যের চাক্ষুষ প্রমাণ হিসেবে আজ গাজীপুর শহর জুড়ে নিয়মবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ বহু বহুতল স্থাপনা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নকশার তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ ভবন ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুক্তিভোগী ও গাজীপুরের সাধারণ নাগরিকদের দাবি, শুধু বিভাগীয় লোকদেখানো তদন্ত নয়, বরং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলা হোক। একই সাথে, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

