অনুসন্ধানী প্রতিবেদন (পর্ব-১): ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জাহাঙ্গীর-শাজাহান-সাজু সিন্ডিকেটের ‘ওপেন সিক্রেট’ ঘুষ বাণিজ্য
বৃহস্পতিবার। ১৪ মে, ২০২৬
রাজধানীর ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, খোদ সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের প্রত্যক্ষ মদদে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন অফিস সহকারী শাজাহান ও উমেদার সাজু সহ একাধিক চক্র নিয়ে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সিন্ডিকেটের কবলে সেবাগ্রহীতারা:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধন করতে আসা সাধারণ মানুষ পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকার নির্ধারিত ফি-র বাইরেও প্রতিটি দলিলের জন্য গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ‘কমিশন’। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা বা নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
নেপথ্যে যারা:
শাজাহান: সিন্ডিকেটের মূল পরিকল্পনাকারী:
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রতিটি অবৈধ কর্মকাণ্ডের কলকাঠি নাড়েন অফিস সহকারী শাজাহান। তিনি পর্দার আড়ালে থেকে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অফিসের নথিপত্র কারসাজি, ফাইল আটকে রাখা এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে হয়রানির পুরো পরিকল্পনাটিই আসে তার টেবিল থেকে। ভুক্তভোগীদের মতে, শাজাহানকে এড়িয়ে বা তার মর্জি ছাড়া কোনো ফাইল নড়াচড়া করা অসম্ভব।
সাজু: অর্থের জোগান ও লেনদেনের ‘হোতা’
এই সিন্ডিকেটের অর্থের যোগান এবং অবৈধ লেনদেনের প্রধান দায়িত্ব পালন করেন উমেদার সাজু। জমির দলিল নিবন্ধন করতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরকারি ফি-এর বাইরে যে বিপুল পরিমাণ ঘুষ আদায় করা হয়, তার সিংহভাগই জমা হয় সাজুর কাছে। অফিসের প্রতিটি স্তরে ঘুষের টাকা পৌঁছানো এবং তা হিসাব-নিকাশ করার কাজটি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, টাকা ছাড়া তিনি সেবাগ্রহীতাদের সাথে কথাও বলেন না।
অফিসের ভেতরের সূত্রগুলো জানায়, এই সিন্ডিকেটের প্রধান কারিগর অফিস সহকারী শাজাহান এবং তার অন্যতম সহযোগী উমেদার সাজু। তারা সাব-রেজিস্ট্রারের নাম ভাঙিয়ে এবং তার প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের পকেটে যায়, যার ফলে তিনি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন।
দুর্নীতির ধরন:
দলিল পাশ: প্রতিটি দলিল পাশের জন্য নির্দিষ্ট হারে টাকা দিতে হয় শাজাহান ও সাজু বাহিনীকে।
ভুয়া এনওসি ও পর্চা: অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ দলিলকেও টাকার বিনিময়ে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
উমেদার সাজু অফিসের সব গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সেবাগ্রহীতাদের সাথে দর কষাকষি করেন।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, “আমার সব কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সিন্ডিকেটের দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় তিনদিন ধরে ঘুরানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত শাজাহানের মাধ্যমে টাকা দিয়ে তবেই কাজ করাতে পেরেছি।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সাব-রেজিস্ট্রারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সুধীসমাজের উদ্বেগ:
এই দুর্নীতির ফলে সরকারের রাজস্ব যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে তীব্র ক্ষোভ। স্থানীয় সচেতন মহল এবং সেবাগ্রহীতারা অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
