বিশেষ প্রতিবেদক | তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
স্বচ্ছতা আনয়ন ও দুর্নীতি রোধে সারা দেশের সাব-রেজিস্ট্রারদের পদায়ন ও বদলিতে লটারি ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়। এমনকি খোদ আইনমন্ত্রী একাধিক সামাজিক ও সরকারি অনুষ্ঠানে স্বীকার করেছিলেন—সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় দেশের অন্যতম বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ বিভাগ। তবে এই ‘লটারি-নাটকের’ আড়ালেই নীরবে সম্পন্ন হয়েছে বহু কাঙ্ক্ষিত ও কৌশলগত বদলি আদেশ, যা মন্ত্রণালয়ের নীতি ও স্বচ্ছতার দাবিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
লটারির আগেই বদলি: অলৌকিক পদায়ন লটারি পদ্ধতির স্বচ্ছতার আড়ালে চাপা পড়ে যায় বিশেষ সুবিধাভিত্তিক বদলির গোপন প্রক্রিয়া। নির্ভরযোগ্য সূত্র ও নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, লটারি আয়োজনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে জামালপুরের বকশীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমানকে ঢাকা সংলগ্ন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ পূর্ব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের বদলি নীতিমালায় ঢাকার আশপাশের লাভজনক বা ‘উর্বর’ অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘমেয়াদে বা বারবার অবস্থান করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মো. মজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে তা অনায়াসে শিথিল করা হয়েছে। এর আগেও তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্বে ছিলেন।
টেকনাফ থেকে রূপগঞ্জ: বিতর্কের দীর্ঘ তালিকা
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাব-রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমানের ক্যারিয়ারজুড়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে:
সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ): শিল্পাঞ্চল ও আবাসন প্রকল্প-সংলগ্ন এই এলাকায় দায়িত্বে থাকাকালে দলিল মূল্যায়ন কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এবং দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগের তদন্ত ফাইল এখনও চাপা পড়ে আছে।
রূপগঞ্জ পূর্ব (বর্তমান কর্মস্থল): পদায়নের পরপরই রূপগঞ্জ পূর্ব কার্যালয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সিন্ডিকেট।
রূপগঞ্জ পূর্বে প্রকাশ্য অনিয়ম
বিশেষ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রূপগঞ্জ পূর্ব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মো. মজিবুর রহমান যোগ দেওয়ার পর অনিয়ম এখন ‘খোলামেলা’ নিয়মে পরিণত হয়েছে:
১. নির্দিষ্ট দালাল সিন্ডিকেট: সাধারণ জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা সরাসরি দলিল রেজিস্ট্রি করতে গেলে নানাবিধ আইনি জটিলতার অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। তবে নির্দিষ্ট কয়েকজন দলিল লেখকের মাধ্যমে ‘নির্দিষ্ট হারে ঘুস’ পৌঁছালে নিমেষেই অনুমোদন পায় অবৈধ ফাইল।
২. শ্রেণি পরিবর্তন ও রাজস্ব ফাঁকি: নাল জমিকে ভিটি বা বাণিজ্যিক জমিকে নাল দেখিয়ে কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার সিংহভাগ কমিশন যাচ্ছে তাঁর নিজস্ব তহবিলে।
৩. লটারির অসারতা: যেখানে অন্যান্য কর্মকর্তাদের দূরের জেলাগুলোতে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়েছে, সেখানে মো. মজিবুর রহমানের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তা কীভাবে বারবার নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও রাজস্ব-উদ্বৃত্ত এলাকাতেই ঘুরেফিরে পদায়ন পান—তা নিয়ে অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁদ আইনমন্ত্রীর উপস্থিততে লটারির মাধ্যমে ঢাকায় পদায়নের জন্য যেই ১৮ জন সাব রেজিস্ট্রার নিশ্চিত করা হয়, তার মধ্যে লটারিতে আসা দ্বিতীয় ব্যক্তি যশোর সদরের সাব রেজিস্ট্রার আমিনা বেগম।
উক্ত ১৮ জন সহ সম্প্রতি প্রকাশিত ৮৫ জন সাব রেজিস্ট্রার বদলি আদেশ হলেও কোনো এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বদলি আদেশে নাম আসেনি লটারিতে আসা দ্বিতীয় ব্যক্তি আমিনা বেগমের। তাহলে কি লটারিতেও রয়েছিলো কোন এক সিন্ডিকেটের প্রভাব।
বদলি প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার আরেকটি প্রমান হচ্ছে ময়মনসিংহ সদরের বিতর্কিত সাব রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি আদেশ হয় নেত্রকোনার বারহাট্টা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কিন্তু তিনি অদৃশ্য ক্ষমতাবলে আদেশটি পরিবর্তন করে যোগদান করেন গাজীপুরের শ্রীপুর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে।

