ঢাকাশনিবার , ২৩ মে ২০২৬
  1. অনিয়ম ও দুর্নীতি
  2. অর্থনীতি
  3. আইটি
  4. আইন ও বিচার বিভাগ
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইসলাম ও জীবন
  7. কৃষি
  8. খেলা
  9. চাকরি
  10. জাতীয়
  11. ধর্ম
  12. নির্বাচন
  13. প্রবাস
  14. প্রশাসন
  15. বানিজ্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের মৌন সম্মতি: ময়মনসিংহে রমরমা ‘স্পীড মানি’ বাণিজ্য

বিশেষ প্রতিনিধিঃ
মে ২৩, ২০২৬ ১২:০৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের মদদে রমরমা ঘুষ বাণিজ্য, ভোগান্তিতে সেবাগ্রহীতারা

ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর প্রকাশ্য ঘুষ লেনদেনের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের রহস্যজনক নীরবতা এবং পরোক্ষ মদদে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ফির কথা বলা হলেও, বাস্তবে প্রতিটি পদক্ষেপে ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করা এখন এই অফিসের নিত্যদিনের চিত্র।

বেলা ১১টায় অফিসে আগমন, কৃত্রিম ভিড় সৃষ্টি

সরেজমিনে ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসান সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন বেলা ১১টার পর অফিসে আসেন। তাঁর দেরিতে আসার কারণে সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা সেবাগ্রহীতাদের উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, দুপুরের দিকে তিনি কার্যক্রম শুরু করেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবেই এই কৃত্রিম ভিড় বা জটলা বজায় রাখা হয়। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে দালাল ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা সেবাগ্রহীতাদের দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার নাম করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।

ছবিঃ অফিস সহকারী আফরোজা বেগম প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য

অফিস সহকারী আফরোজার প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি অফিস সহকারী আফরোজা বেগম। দলিল যাচাই-বাছাই ও সিরিয়াল দেওয়ার নামে তিনি প্রকাশ্যেই টেবিলের ওপর টাকা (ঘুষ) গ্রহণ করেন। টাকা ছাড়া কোনো ফাইলই তাঁর টেবিল থেকে নড়ে না। সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তি পোহালেও, যারা আফরোজার হাত গরম করতে পারেন, তাদের ফাইল মুহূর্তেই ছাড় পেয়ে যায়।

শেষ ধাপেও নিস্তার নেই, টিপসইয়ের টেবিলে টাকা আদায়

অভিযোগের পাহাড় এখানেই শেষ নয়; জমি রেজিস্ট্রেশনের একদম শেষ ধাপ তথা ‘টিপসই’ দেওয়ার টেবিলেও চলে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। দাতা ও গ্রহীতা যখন দলিলে চূড়ান্ত স্বাক্ষর বা টিপসই দিতে যান, তখন সেখানে দায়িত্বরত কর্মচারীরা সরকারি নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা দাবি করেন। ভুক্তভোগীরা জানান, এই টেবিলে দাবি করা টাকা না দিলে টিপসই নিতে গড়িমসি করা হয়, আঙ্গুলের ছাপ মিলছে না বলে অজুহাত তৈরি করা হয় এবং ফাইল আটকে রেখে গ্রাহককে মানসিক চাপে ফেলা হয়। ফলে বাধ্য হয়েই প্রত্যেকে এই টেবিলেও অতিরিক্ত টাকা দিয়ে রেহাই পান।

দলিল লেখকদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা আদায়

অভিযোগ রয়েছে, এই অফিসে সরাসরি ঘুষ লেনদেনের পাশাপাশি দলিল লেখকদের (ডিড রাইটার) একটি বড় অংশকে সিন্ডিকেটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে যে অতিরিক্ত টাকা (স্পিড মানি) নেওয়া হয়, তার বড় অংশই দলিল লেখকদের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে আগেভাগেই আদায় করা হয়। দলিল লেখকরাও সাব-রেজিস্ট্রার ও অফিসের কর্মচারীদের ভাগের কথা বলে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।

মসজিদের ওয়াকফ দলিলেও অতিরিক্ত টাকার দাবি!

সিন্ডিকেটের লোভ থেকে রেহাই পাচ্ছে না ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আল্লাহর ঘরের জন্য বা মসজিদের নামে জমি ওয়াকফ করে দেওয়ার দলিলেও সরকারি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। ধর্মীয় কাজে দান করা জমির দলিল সম্পাদন করতে এসেও যখন অতিরিক্ত টাকার জন্য ফাইল আটকে দেওয়া হয়, তখন সেবাগ্রহীতাদের ক্ষোভ ও হতাশা চরমে পৌঁছায়।

নকল তুলতেও পকেট কাটা যাচ্ছে গ্রাহকদের

জমি রেজিস্ট্রির পর মূল দলিলের নকল (সার্টিফাইড কপি) তোলার ক্ষেত্রেও চলছে চরম নৈরাজ্য। নকলনবিশ এবং সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মচারীরা সরকারি ফির বাইরে কয়েক গুণ বেশি অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন। গ্রাহকরা নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দিলেও অতিরিক্ত টাকা না দিলে দিনের পর দিন ঘোরানো হয় এবং নানা অজুহাতে নকল সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। টাকা দিলেই কেবল দ্রুত মেলে কাঙ্ক্ষিত নকল।

রমরমা ঘুষ বাণিজ্য

এজলাসে কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা ও আড়ালের কৌশল

দলিল সম্পাদনার সময় এজলাসে বা সাব-রেজিস্ট্রারের কক্ষে কোনো ধরনের শৃঙ্খলা থাকে না। নিয়মের তোয়াক্কা না করে দলিল লেখকরা সাব-রেজিস্ট্রারের গায়ের ওপর উপচে পড়ে থাকেন। কে আগে সই করাবেন, তা নিয়ে চলে চরম হট্টগোল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ মূলত একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এজলাসে ইচ্ছাকৃতভাবে এই হট্টগোল বজায় রাখা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত থাকে এবং এই সুযোগে কোন ফাইলগুলো সই না করে আটকে দেওয়া হচ্ছে আর কোনগুলো গোপনে সুবিধা নিয়ে পাস করানো হচ্ছে, তা যেন কেউ টের না পায়।

আসল রফাদফা ও নিয়মবহির্ভূত কাজ ‘খাস কামরায়’

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এজলাসে সাধারণের সামনে নিয়মের বুলি আওড়ালেও সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের আসল সিন্ডিকেট চলে তাঁর ‘খাস কামরা’র (ব্যক্তিগত কক্ষ) ভেতরে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেসব ফাইলের কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ বা নিয়মবহির্ভূত, সেগুলোর বেশির ভাগই সাধারণের চোখের আড়ালে খাস কামরায় বসে সম্পাদন করা হয়। নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের দলিল লেখক ও বিশ্বস্ত দালালরা মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তি চূড়ান্ত করার পর ফাইল নিয়ে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরায় প্রবেশ করেন। সেখানে কোনো সাধারণ সেবাগ্রহীতার ঢোকার অনুমতি না থাকলেও, অবৈধ লেনদেনের ফাইলগুলো টেবিলের নিচে বিশেষ সমঝোতায় মুহূর্তেই সই হয়ে যায়। এই খাস কামরাই মূলত সব নিয়মবহির্ভূত কাজের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতা ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি

জমির দলিল করতে আসা একাধিক সেবাগ্রহীতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে টাকা ছাড়া কোনো কথা নেই। সরকারি ফির বাইরে প্রতিটি টেবিলে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। মসজিদের দলিলের মতো পবিত্র কাজেও এরা টাকা ছাড়া সই করতে চায় না। সাব-রেজিস্ট্রার সাহেব দেরিতে আসেন, আর উনার কর্মচারীরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে টাকা আদায় করে। দেখার যেন কেউ নেই।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি সেবাখাতে এমন প্রকাশ্য দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিমের ঝটিকা অভিযান চালানো প্রয়োজন। এই সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে ধরতে এবং ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুদকের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী মহল।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের সাথে একাধিকবার মুঠো ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।