আমাদের সংখ্যাগত নয়, মানসম্পন্ন শিক্ষা দরকার — অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি
আজ ১৯ মে মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে “শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও জাতীয় উন্নয়ন” শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।
এতে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এমপি, দেওয়ান সালাহ উদ্দিন বাবু এমপি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির, জনাব সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন এমপি, ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ এমপি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জনাব সরোয়ার তুষার, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল জনাব সিবগাতুল্লাহ, শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারগণ।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, বাজেট আসে, বাজেট যায়। ১৯৮৪ সাল থেকে অনেক বাজেট দেখেছি—কখনো ভেতরে থেকে, কখনো বাইরে থেকে। কিন্তু বাজেটগুলোর মধ্যে চরিত্রগত কোনো পার্থক্য দেখিনি। একই পদ্ধতিতে সব চলছে। আমরা “গৎবাঁধা বাজেট”, “গরিব মারার বাজেট” নামে স্লোগান দিয়েছি, কিন্তু বাজেটের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, বাজেটের পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন আমাদের উপার্জিত অর্থ হালাল হবে। হারাম অর্থ দিয়ে প্রণীত বাজেটে কোনো বরকত থাকতে পারে না। ব্যক্তি যেমন হালাল উপার্জন করবে, তেমনি জাতীয় উপার্জনও হতে হবে হালাল। হারাম দিয়ে জাতির কোনো কল্যাণ সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, বাজেট এলেই জনগণের মধ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আতঙ্ক তৈরি হয়। এমনিতেই তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বাজেট এলেই সাধারণ মানুষ আরও পেরেশান হয়ে পড়ে। তাই কৃষক, শ্রমিক ও শিক্ষকদের বাজেট বিশ্লেষণ করে জনগণের কল্যাণে কী করা যায়, তা দেখতে হবে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন ফরজ। এই জ্ঞান কি শুধু ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি কিংবা বাজেটের জ্ঞান? আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের যদি কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক জ্ঞান না থাকে, তাহলে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের জন্য সেই শিক্ষা উপযোগী হতে পারে না। তাই আমাদের সবার সামনে কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক চেতনাকে রাখতে হবে। আমাদের সংখ্যাগত নয়, মানসম্পন্ন শিক্ষা দরকার। তাহলেই শিক্ষার মান বাড়বে, ইনশাআল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, সুদভিত্তিক অর্থনীতি ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে কল্যাণ আনতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা সুদকে ধ্বংস করেছেন, কারণ এটি মানুষকে ধ্বংস করে। পক্ষান্তরে দান ও জাকাতের মাধ্যমে মানুষের প্রতি এহসানকে তিনি বর্ধিত করেছেন, যার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ এমপি বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা খরচে শিক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক অদৃশ্য খরচ রয়েছে। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সহজলভ্য নয়। শুধু বই ও স্কুলের বেতন ফ্রি করলেই শিক্ষা পুরোপুরি অবৈতনিক হয় না।
তিনি বলেন, কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান দুটি ধারাই অনুপযোগী। শিক্ষার্থীরা ভোকেশনাল ও মূলধারার শিক্ষা আলাদা করে বড় হচ্ছে। অথচ একটি স্কুল ও একটি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। এসএসসি পাসের আগেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি বৃত্তিমূলক দক্ষতা দেওয়া সম্ভব। এতে মূলধারার শিক্ষার্থীরাও দক্ষ হয়ে উঠবে।
অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রব বলেন, বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা হয়। অথচ শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ অন্যান্য দেশে ৫ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয় করা হয়। ফলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। তাই শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।
তিনি মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তিনি ক্ষমতায় এসে শিক্ষাখাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দেশের মেধাবী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার ও অধ্যাপকদের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা দিলে তারা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসবেন। বর্তমানে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ বরাদ্দ থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে শিক্ষাখাতে চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। শিক্ষাব্যবস্থায় দলীয়করণ হলে পুরো ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও মেধার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের আগে একটি সমন্বিত শিক্ষানীতি প্রয়োজন, যেখানে জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, আদর্শ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় থাকবে। তাহলেই নতুন প্রজন্ম নৈতিক ও আদর্শবান হয়ে গড়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাখাতের বাজেট এমনভাবে বাড়াতে হবে, যেন গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানরাও মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বর্তমানে দেশে যোগ্য উপাচার্যদের সরিয়ে দলীয়ভাবে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এখনও ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণার প্রভাব বহন করছে। ব্রিটিশদের প্রবর্তিত শিক্ষা কাঠামো স্বাধীনতার পরও মূলত অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে এই শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। গবেষণার অভাবও প্রকট। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন অত্যন্ত কম; বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভারতে প্রায় দ্বিগুণ।
খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, সকল শিক্ষাব্যবস্থার মূল হলো নৈতিক ও আল্লাহভিত্তিক শিক্ষা। শিক্ষাই মানুষের জীবনের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাখাতে মাত্র ১.৬ থেকে ১.৮ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে দায়সারা অবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাখাতের বাজেটকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত আদর্শ সমাজ গঠন সম্ভব হবে এবং একটি যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত জাতি গড়ে উঠবে।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, আমরা সহজভাবে মনে করি শিক্ষা হলো মানুষের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এর মধ্যে নৈতিক শিক্ষাও থাকতে হবে—সেটি স্কুল, মাদরাসা বা ক্যাডেট কলেজ যেখানেই হোক না কেন।
তিনি বলেন, আমাদের সেনাবাহিনীর প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা ক্যাডেট কলেজ থেকে আসেন। তারা কাঁটা-চামচ দিয়ে খেতে অভ্যস্ত। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে কি তারা কাঁটা-চামচ পাবে? আমরা এসব বিষয়ে প্রশ্ন করি না, কথাও বলি না।