বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসুন ভেবে দেখি : মো.শহিদুল্লাহ

এনামুল হক রাসেল এনামুল হক রাসেল

,সম্পাদক, দ্য বিডি রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৫:২০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২০
মো.শহিদুল্লাহ

মো.শহিদুল্লাহ: “প্রহারের দর্শন ও শ্রবণ ভীতিকর কিন্তু প্রহার খাইতে তেমন কষ্ট নেই” রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর এই উক্তির সাথে আমার মনে হয় সবাই একমত পোষণ করবেন৷ ভয় মানুষের মনে স্থায়ীভাবে দাগ কাটে, অন্ধকার রাস্তায় আড়াআড়িভাবে পড়ে থাকা রশিকে সাপ মনে করে আমরা আঁতকে উঠি৷ কোনদিন ভূত দেখার অভিজ্ঞতা না থাকলেও শুধু ছোটোরা নয় প্রাপ্ত বয়স্কদের মনও ভূতের ভয়ে আচ্ছন্ন থাকে, অপরাধ ও অপরাধ ভীতি দুটি পৃথক সমস্যা৷

 

 

 

অপরাধ ভীতি হলো সম্ভাব্য অপরাধের শিকার হওয়ার অহেতুক ভয় যা প্রকৃত অপরাধের শিকার হওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিভিন্ন সামাজিক উৎস বা প্রচার মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনের খবর ইত্যাদি প্রচারের ফলে উৎপত্তি হয়৷ অপরাধ ভীতি সংক্রামক, প্রকৃত অপরাধের মতোই অপরাধ ভীতি সমাজে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর শারীরিক মানসিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ শহরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দ্বারা নগরিক ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও তাদের নাম শুনে মানুষ আতকে উঠেছে৷ কালা জাহাঙ্গীর বা পিচ্ছি হান্নানের নাম দিয়ে ছিঁচকে চোর বাটপাররাও টেলিফোনে সাধারণ মানুষের কাছে চাঁদা দাবি করেছে৷

 

 

আমাদের দেশের মানুষ হুজুগ প্রবন৷ কান নিয়েছে চিলে শুনে চিলের পিছনে দৌড় মারা আমাদের দেশের মানুষের মজ্জাগত অভ্যাস৷ কিন্তু কান আসলেই চিলে নিয়েছে না কান তার জায়গামতো আছে কেউ তা হাত দিয়ে পরখ করে দেখে না৷ আমাদের দেশের মানুষ কাউকে মাথার উপরে তুলতে আবার মাটিতে নামিয়ে আনতে বেশি সময় নেয় না৷ একটা কিছু পেলেই সবাই হুজুগে মেতে ওঠে৷ বর্তমানে আমাদের দেশের সব ফোরামের আলোচিত বিষয় পুলিশের আচরণ নিয়ে৷ আমাদের উপমহাদেশে পুলিশের যাত্রা শুরু হয় ১৮৬১ সালের ৫ নম্বর আইন এর মাধ্যমে৷ ব্রিটিশরা বঙ্গ ভারত উপমহাদেশে দেশীয়দের স্বাধিকার আন্দোলন দমিয়ে শাসন ও শোষণ নির্বিঘ্ন করাসহ খাজনা আদায়ের কাজ সহজতর করতে নিয়মিত পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেছিলো৷ প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই এই উপমহাদেশে পুলিশ বাহিনী গণবিরোধী শক্তিরূপে পরিচিতি পায়৷ ব্রিটিশ শক্তির সকল অপকর্ম হাসিলের হাতিয়ার হয়ে নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে যায় পুলিশ বাহিনী৷ জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনী আর ব্রিটিশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কোন তফাৎ ছিল না৷ সত্য কথা এই যে এই উপমহাদেশে তথা বঙ্গ ভারতে পুলিশের ইতিহাস করুন৷ ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের দ্বারা পুলিশ বিভাগ সৃষ্টি হবার পর পদ্মা মেঘনা যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়ালেও সেই ১৮৬১ সালের আইনে তৈরি পুলিশ বাহিনী সংস্কারের জন্য কোন যুগোপযোগী সংস্কারের পদক্ষেপ আজও নেওয়া হয়নি৷ যে ব্রিটিশ আমাদের পুলিশ বাহিনী তৈরি করেছিল সে দেশের পুলিশকে জনগণ ববি বলে সম্বোধন করে সম্মান করে, আর আমাদের দেশে পুলিশকে মানুষ কোনদিন আপন ভাবতে শেখেনি৷ আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনী জনগণের বন্ধু হবার জন্য অব্যাহতভাবে চেষ্টা করে গেলেও মানুষের মন মানসিকতা আদৌ পরিবর্তন হয়নি৷ পুলিশ জনগণের বন্ধু কি-না এ প্রশ্ন সবাই তুললেও জনগণ পুলিশের বন্ধু কি-না সে প্রশ্ন কেউ কোনদিন তোলে না৷ পুলিশ সদস্যদের কোন রাজনৈতিক বিক্ষোভ কিংবা শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকাতে গিয়ে কোন রাজনৈতিক কর্মী বা শ্রমিক মৃত্যুবরণ করলে তা নিয়ে চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়, লাশ নিয়ে মিছিল মিটিং হয় মানববন্ধন হয়; পুলিশের নিন্দায় দেশ-বিদেশ মুখর হয়ে ওঠে৷ কিন্তু একই ঘটনায় কোন পুলিশ সদস্য মারা গেলে কেউ কিছুই বলেনা যেন ইট পাটকেল খেয়ে ক্যাডারদের পটকা বুলেটে বুক ঝাঝরা করার জন্যই পুলিশের জন্ম হয়েছে৷ রাজপথে পুরুষ পিকেটার বিক্ষোভকারীরা নারী পুলিশকে চুলের মুঠি ধরে তুলে আছাড় মারলেও কেউ তাতে দোষ দেখতে পান না কারণ নারী হলেও সে পুলিশ, তাদের আবার ইজ্জত কী? কিন্তু নারী পুলিশ কর্তৃক নারী রাজনৈতিক কর্মীকে পুলিশ ভ্যানে তুলতে গেলে তুলকালাম বাঁধে,আর পত্রিকার ৬ কলামজুড়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়৷ পত্রিকার পাতায় পুলিশের কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে সম্পাদকীয় ও উপ সম্পাদকীয় লেখা হয়, দেশে-বিদেশে পুলিশ ধিকৃত হয়৷ নারী পুলিশ নারী নয় যেন তারা কেবলই পুলিশ৷ পিকেটাররা রাজপথে যুবক পুলিশের প্যান্ট খুলে নিলে পত্রিকায় ছাপা হয়ে মানুষের হাসির খোরাক জোগায় কেউ একটু সহানুভূতিও করে না৷ বাংলাদেশে সবার ইজ্জত আছে কিন্তু পুলিশের কেবল ইজ্জত নাই৷ আইন বেঁধে দিয়েছে পুলিশের কাজে জনগণকে সহায়তা দিতে হবে৷ তারা আসামি গ্রেপ্তার করতে তথ্য দিয়ে এবং কায়িকভাবে পুলিশকে সাহায্য করবেন৷ কোন মামলার আলামত জব্দ কিংবা মৃতের সুরতহাল প্রতিবেদন এর জন্য কোন সাক্ষীই খুঁজে পাওয়া যায় না৷এইসব ক্ষেত্রে পুলিশের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত৷ এদেশের মানুষ সবসময় আইনি কার্যক্রমকে এড়িয়ে চলতে চায়৷ একটা বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গেলে চারিদিকে হাজার মানুষ ভিড় করে তাদের সামাল দিতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়৷ কিন্তু যখন সুরতহাল রিপোর্টে সাক্ষর করতে বলা হয় বা সাক্ষীদের নাম জিজ্ঞাসা করা হয় তখন সই করা তো দূরের কথা কেউ নিজের নামটি পর্যন্ত বলতে চায় না৷ পুলিশকে প্রায় সময় মানুষকে অনুরোধ করতে হয়৷ পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও সাক্ষীরা আদালতে হাজির হতে চায় না ফলে অনেক সময় আসামি খালাস পায়৷ আমজনতার ভাষ্য পুলিশ সবই জানে কিন্তু আসলে পুলিশ সবজান্তা নয়৷ আর সব জানলেও বা লাভ কী? পুলিশ হেফাজতে পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দির সাক্ষ্যগত কোন মূল্যই নেই৷ পুলিশের দেওয়া সাক্ষ্যতে যদি কাজ হতো তাহলে পুলিশ দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণ ভরিয়ে দেয়া যেত কিন্তু অস্ত্রসহ ধৃত আসামির বিরুদ্ধে ১০০০ পুলিশের সাক্ষী চেয়ে একমাত্র পাবলিক সাক্ষীকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হয়৷ জনগন পুলিশকে বিশ্বাস করতে চায় না, কোন ঘটনার আদ্যোপান্ত বিচার না করে তারা প্রথমেই পুলিশকে দোষারোপ করে৷ পুলিশকে মানবাধিকার ভঙ্গের জন্য জনতার আদালতে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু পুলিশ সদস্যরাও মানুষ; তাদেরও মানবিক অধিকার আছে৷ তাদের রোগ শোক জ্বরা মৃত্যু সুখ দুঃখ আছে৷ কিন্তু জনগণ সেসব কখনো বিচার করে না৷ একজন সাজাপ্রাপ্ত খুনি কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির মানবাধিকার রক্ষার জন্য সমাজ সোচ্চার পুলিশের অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে তার সিকিভাগও সচেষ্ট নয়৷ সমাজের সব সমস্যা সমাধানের ভার জনগণ পুলিশের উপর ছেড়ে দিয়ে নিজেরা নিশ্চিন্তে সময় কাটাতে চায়, কিন্তু তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তারা কতটুকু পালন করেছেন তা ভাবেন না৷ পুলিশকে দিয়ে তারা দিবা রাত্র ২৪ ঘন্টা পরিশ্রম করিয়ে নেন৷ পুলিশকে জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করার তাগিদ দিলেও জনগণ পুলিশের কল্যাণ-এর কথা কতটুকুই বা ভাবে৷ তাই সবসময় পারস্পরিক অবিশ্বাস আর সন্দেহের বিষয় পুলিশ ও জনতার মাঝে ঝুলতে থাকে৷ জনগন পুলিশকে বিশ্বাস করতে পারে না আবার অবিশ্বাস করতেও চায়না-কারণ ফৌজদারি সমস্যা দেখা দিলে তা দেখভাল করার জন্য পুলিশকে দায়িত্ব নিতে হয়৷ অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে একজন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত টেলিফোন ব্যবহার না করেও একজন বেসরকারি মোবাইল ফোনের উপর নির্ভর করতে পারেন; কিন্তু সরকার নিয়ন্ত্রিত থানা পুলিশ ছড়া নিরাপত্তা মামলা-মোকদ্দমা সমস্যায় অন্য কোন স্থানে যাওয়ার জায়গা নেই৷ বেসরকারি পুলিশ কোনো দেশেই নেই৷ মামলা রুজু মামলা তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার ব্যবস্থার কোন অংশে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি৷ অন্যদিকে জনগণ তথ্য না দিলে আসামি গ্রেপ্তার করা যায়না, মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে হলে জনগণের সাক্ষ্য দরকার হয়৷ তাই জনগণ ছাড়া পুলিশের যেমন কোন অস্তিত্বই থাকে না৷ অন্যদিকে পুলিশ ছাড়া জনতা অসহায়৷ কেউ আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়ে ব্যথা পেলে যেমন বাবা বাবা বলে ডাক চিৎকার করে ওঠে তেমনি চোর ডাকাত দুষ্কৃতকারী কর্তৃক আক্রান্ত হলে তারা পুলিশ পুলিশ বলে সাহায্য প্রার্থনা করে৷ তাই পুলিশ-জনতা একে অপরের উপর নির্ভরশীল৷ কিন্তু তার পরেও অধুনা পুলিশ এবং জনতার মাঝে যোজন যোজন দূরত্বের সৃষ্টির পায়তারা চলছে৷ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের অপরিণামদর্শী কাজের জন্য সমগ্র পুলিশবাহিনীকে দোষারোপ করা হচ্ছে৷ কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন পুলিশ সদস্য যে সমগ্র পুলিশ বাহিনী নয় সেটা অনেকেই ধারণার মধ্যে রাখেন না৷ কিন্তু ভুলে গেলে তো চলবে না হলি আর্টিজান এর সেই জঙ্গির বন্দুকের নলের মুখে পুলিশই প্রথম বুক পেতে বুকের তাজা রক্তে হলি আর্টিজানে মেঝে রক্তাক্ত করেছিল৷ এ কদিন আগেও করোনার ক্রান্তিকালে পুলিশই প্রথম সাহসী যোদ্ধার ভূমিকায় থেকে মৃত করোনা রোগীকে সমাধিস্থ করেছে, নিজের বেতন খাবার সামগ্রী নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটে গেছে, এক ভোর থেকে আরাক ভোর পর্যন্ত পুলিশ মাক্স স্যানিটাইজার হ্যান্ড গøাভস নিয়ে ছুটে গেছে মানুষের কাছে করোনার সংক্রমণ থেকে তাদের নিষ্কৃতি প্রদানের জন্য৷ এসব কাজ করে যখন পুলিশের ভাবমূর্তি আকাশচুম্বী তখনই এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত সবার সব কল্পনার রঙিন সুতোকে ছিড়ে ফেলে অমানিশার অন্ধকার ডেকে এনেছে৷ আজ যেন পুলিশ এদেশের এক অনাকাক্সিক্ষত গোষ্ঠী হিসেবে পরিগণিত হতে যাচ্ছে আর তাদের মানুষের কাছে অজনপ্রিয় করার জন্য কিছু মানুষকে বুঝে না বুঝে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে৷ কিন্তু সবাইকে মনে রাখতে হবে আমরা পরশ্রীকাতর, একজন অন্যজনের ভালো দেখতে পারি না৷ পুলিশের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে কেউ মাটিতে নামিয়ে আনতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোন কিছু অতিরঞ্জিত করছেন কিনা সেটা ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে৷ কে দোষী কে নির্দোষী তা সময়ই বলে দেবে৷ তবে ব্যক্তিবিশেষের অপকীর্তির দায়ভার সবার উপরে চাপাবেন না৷এতে করে সমাজে আমাদের হেয় হতে হয়৷ আমাদের পরিবার-পরিজনকেও সমাজে অস্বস্তিকর পরিবেশ এর মধ্যে থাকতে হয়৷

 

 

সবচেয়ে বড় কথা ২০০৭ সালের পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির যে প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে সেটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কার্যকরী হওয়া অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে৷ তাই আগেভাগে সব পুলিশকে খারাপ না ভেবে আসুন সময়ের অপেক্ষায় থাকি, ধর্মের কল একদিন অবশ্যই বাতাসে নড়বে৷

 

লেখক: সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, লেখক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।