প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ঐতিহ্যবাহী ঢোল সমুদ্র দীঘি

এনামুল হক রাসেল এনামুল হক রাসেল

,সম্পাদক, দ্য বিডি রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৭:২১ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২০

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভরপুর ঝিনাইদহ। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির দিক দিয়ে অন্যান্য জেলার থেকে অনেক এগিয়ে আছে ঝিনাইদহ জেলা। ইতিহাস-ঐতিহ্য এক অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে এই ঝিনাইদহে। বিভিন্ন মৌসু্মে হরেক রকমের ফসল রয়েছে সুপ্রাচীন খ্যাতি।

 

 

 

তার মধ্যে উল্লেখ্য হলো ধান, গম, আম,পাট,আখ, খেজুরের গুড়, কলা-পান ইত্যাদি। মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি এবং প্রাণজুড়ানো আবহাওয়া ছাড়াও এই জেলায় রয়েছে প্রাচীন বিভিন্ন স্থাপনা মসজিদ, মন্দির ছাড়াও রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক স্থান। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঝিনাইদহের ঢোল সমুদ্র দীঘি। প্রায় ৫২ বিঘা জমির উপর অবস্থিত এই দীঘি ঝিনাইদহের সর্ববৃহৎ দীঘি। সুন্দর এবং মনোরোম পরিবেশ বিশিষ্ট এই দীঘি। বহুবছর আগে থেকেই এই দীঘি ঝিনাইদহে বিনোদনের একটি অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিভিন্ন উৎসবে যেমন পহেলা বৈশাখ,বিশ্ব ভালোবাসা দিবস,ঈদ,বিভিন্ন পূজায় অনেক মানুষ ভিড় জমায় এই দীঘিতে। আবার অনেকেই দল বেঁধে এই দীঘির পাড়ে পিকনিক করতে আসে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সময় কাটায় এই দীঘিতে। দীঘির চারিদিক ছোট ছোট টিলা দ্বারা বিশিষ্ট। টিলার উপর থেকে নজর কাড়া দৃশ্য উপভোগ করা যায়। যা একজন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের হৃদয় মুহুর্তেই কেড়ে নিবে।

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,ঝিনাইদহে রাজা মুকুট রায় নামে এক প্রভাপশালী জমিদার ছিলেন। ঝিনাইদহ তার রাজ্যের রাজধানী ছিলো। তিনি খাঁন জাহান আলী (রাঃ) এর মত জলাশয় প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী এবং যতœবান ছিলেন। রাস্তা নির্মাণ ও জলাশয় খনন করতে করতে তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় এবং রাজ্যের জলকষ্ট লাঘবের জন্য তিনি ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী পাগলা কানাই ইউনিয়নে খনন করেন ঢোল সমুদ্র দীঘি। ঢোল সমুদ্র দীঘিটি শতাব্দী পরিক্রমায় পানীয় জলের অফুরন্ত আধার হিসেবে এবং একজন পরাক্রমশালী রাজার রাজকীয় স্থাপনা সমূহের একটি স্মৃতি হিসেবে আজও টিকে আছে ঝিনাইদহের বুকে। ঢোল সমুদ্র দীঘি খননের পেছনে রূপকথাকে হার মানানো একটি লোকশ্রæতি আছে-রাজা মুকুট রায়ের রাজত্বকালে একবার জলকষ্ট দেখা দেয়। বিল, বাওড়, নদী সব শুকিয়ে গিয়েছিল। কোথাও কোন জল ছিল না। ফলে রাজ্যে জলের সংকট দেখা দিলো। এই জলের সংকট দূর করার জন্য রাজা দীঘি খননের সিদ্ধান্ত নেন। কয়েকশো শ্রমিকে নিয়োগ দেওয়া হয় দীঘি খননের জন্য। শ্রমিকেরা দিন রাত পরিশ্রম করে গভীর হতে গভীরতর এবং চতুর্দিকে প্রশস্ত করে দীঘি খনন করলো। কিস্তু দীঘিতে জল উঠল না। রাজা হতাশ হয়ে পড়লেন এবং দু চিন্তা ভুগতে লাগলেন। একদিন রাতে রাজা ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলেন, রাণী যদি দীঘিতে নেমে পূজা দেন, তবে দীঘিতে জল উঠবে। স্বপ্নের কথা জেনে রাজা পূজার সকল উপকরণের বন্দবস্ত করে প্রজাকল্যাণের স্বার্থে রানীকে পূজা দেওয়ার উদ্দেশ্য দীঘির তলদেশে নামালেন। রাণী পুকুরের তলদেশে উপস্থিত হয়ে ইষ্টদেবতাকে নিবেদন করে পূজা আরম্ভ করলেন। আশ্চার্যজনকভাবে দীঘিতে জল ওঠা শুরু হলো এবং প্রার্থনা পূর্ণ হওয়ায় রাণী উপরে উঠতে শুরু করলেন। সহসা প্রবলবেগে দীঘিতে জল উঠতে লাগলো। দীঘিতে জল দেখে পাড়ে থাকা সকল প্রজারা বাদ্য-বাজনার সাথে উৎসব আনন্দ করতে লাগলো। রাণী দীঘির তলদেশ থেকে পাড়ে উঠতে পেরেছে কিনা সেইদিকে কেউ লক্ষ্যে করেনি। অলক্ষ্যে রাণী অথৈ জলের গভীরে তলিয়ে গেলেন। দুঃসংবাদ পেয়ে রাজা তাৎক্ষণিক দীঘির পাড়ে উপস্থিত হন। রাণীকে খোঁজার জন্য দীঘিতে লোক নামান। কিন্তু অনেক খোঁজখুঁজির পরেও রাণীকে পাওয়া যায়নি। ফলে জলের কষ্ট লাঘব হলেও রাজ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। এই স্মৃতি স্মরণে আজও লোকজন এ দীঘিকে ঢোল সমুদ্র দীঘি বলেই জানে।

পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।